অতীতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পিরামিড তৈরি করা হয়েছে। তবে সাধারণত পিরামিড বললেই আমাদের কল্পনায় ভেসে ওঠে মিশরের পিরামিড। হাজার হাজার বছর ধরে মিশরের পিরামিড ছিল মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় এবং বিস্ময়কর স্থাপনা। সকল ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও বর্তমান যুগে এত বড় নির্মাণ এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
সুপ্রিয় পাঠক, RANDOM SPEECH এর এই আর্টিকেলে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন মিশরের পিরামিড সম্পর্কে আলোচনা করা হবে......
পিরামিড কি?
পিরামিড হলো এক প্রকার জ্যামিতিক আকৃতি, যার বাইরের তলগুলো ত্রিভুজাকার, যা একটি শীর্ষবিন্দুতে মিলিত হয়। পিরামিড একটি বহুভুজাকৃতি ভূমির ওপর অবস্থিত। বহুভুজের ওপর অবস্থিত যে ঘনবস্তুর একটি শীর্ষবিন্দু থাকে এবং যার পার্শ্বতলগুলোর প্রতিটি ত্রিভুজাকার।
পিরামিড কেন তৈরি করা হয়েছিল এবং কে করছেন ?
প্রাচীন মিশরের রাজাদের উপাধি ছিল ফারাও বা ফেরাউন। ফেরাউনদের মৃত্যুর পর তাদের মৃতদেহ মমি করে পিরামিডের ভেতর সমাহিত করা হতো । প্রত্যেক ফেরাউনই তার আগের ফেরাউনের চেয়ে সেরা পিরামিড তৈরি করতে চাইত। কারণ তারা মনে করত ফেরাউনরা মৃত্যুর পর মৃতদের রাজা হিসেবে নতুন দায়িত্ব পালন করত। তাদের মতে পিরামিড হলো ফেরাউনদের পুনর্জন্মের প্রবেশদ্বার। এছাড়া ফেরাউনের মৃত্যুর পর যতদিন তাদের দেহ সংরক্ষণ করা যাবে ততদিন তারা স্বর্গে বাস করবে।
সে জন্যই হাজার হাজার বছর ফেরাউনদের মৃতদেহ সংরক্ষণ করার জন্য তারা এমন দুর্ভেদ্য পিরামিড তৈরি করত। পিরামিডের স্থায়িত্বের তুলনা করতে একটি আরবি প্রবাদ প্রচলিত আছে, তা হলো মানুষ সময়কে ভয় পায় আর সময় ভয় পায় পিরামিডকে। ধারণা করা হয় পিরামিডের প্রথম প্রকৌশলী এবং স্থপতি হল ইম্পহর্টেন্ট। তিনি ছিলেন প্রথম পিরামিড নির্মাণকারী ফেরাউন জোছারের মন্ত্রী। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিদ্যা পারদর্শী ছিলেন। মিশরীয়রা পরবর্তীতে ওষুধের দেবতা হিসেবে ইম্পহর্টেন্টকে পূজা করতো।
মিশরীয়রা যত পিরামিড তৈরি করেছে তার অনেকগুলোই ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রথম দিকের পিরামিডগুলোর তুলনায় পরের দিকের পিরামিডগুলো বেশি টেকসই এবং সুরক্ষিত করে নির্মাণ করা হয়েছে। কারণ মিশরীয়রাও সময়ের সাথে সাথে তাদের পিরামিড তৈরির শিল্পে দক্ষ হয়েছে। মিশরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় 100 টিরও বেশী পিরামিড রয়েছে। সবচেয়ে বিখ্যাত তিনটি পিরামিডের অবস্থান মিশরের গিজা মালভূমিতে।
পিরামিড তৈরির রহস্য
ধারণা করা হয় যে, গ্রেট পিরামিড নির্মাণ করতে ২৩ বছর সময় লেগেছিলো। বিশাল এই নির্মাণযজ্ঞে ২০ থেকে ৫০ হাজার দক্ষ শ্রমিক কাজ করেছে। পিরামিড এর বাইরের এক একটি পাথরের ব্লকের নুন্নতম ওজন একটি প্রাইভেটকারের সমান আর ভেতরের একটি ব্লকের ওজন ৪০ টি প্রাইভেটকারের সমান। ভারী ভারী পাথর দিয়ে নির্মাণ করার কারণে পিরামিড এর ওজন ও অনেক বেশি। গ্রেট পিরামিড এর ওজন প্রায় সাড়ে ৫৭ লক্ষ টন। যা বর্তমান সময়ের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফার ওজনের প্রায় ১২ গুন।
বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রেন দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ টন ওজন ১০০ মিটার পর্যন্ত তোলা যায়। অথচ তারা এত ভারী পাথর প্রায় দেড়শো মিটার উচ্চতায় তুলে অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে জোড়া দিয়েছে যা সত্যিই বিস্ময়কর। পিরামিড এর বাইরের দেয়াল তৈরী করা হয়েছে চুনা পাথরের ব্লক দিয়ে। আর মূল্যবান গ্রানাইট পাথর দিয়ে ভেতরের চেম্বার তৈরী করা হয়েছে।
আধুনিক মেশিন দিয়ে পাথর কাটার প্রযুক্তির সাথে পিরামিড এর পাথর কাটার অবিশ্বাস্য রকমের মিল রয়েছে। তবে বর্তমান যুগের আধুনিক যন্ত্র দিয়েও এত সুন্দর আর নিখুঁত ভাবে পাথর কাটা সম্ভব নয়। সময়ের সাথে সাথে তাদের পাথর কাটার প্রযুক্তি যত উন্নতি হয়েছে পিরামিডগুলো তত টেকসই হয়েছে।
পিরামিডের ভেতরের পাথরগুলো নিখুঁতভাবে কেটে একটির সাথে আর একটিই এমন ভাবে জোড়া দেয়া হয়েছে যে দুই পাথরের মাঝে এক চুলও ফাঁকা নেই। ফলে হাজার হাজার বছর ধরে বাইরে থেকে কোন পানি বা আদ্রতা পিরামিডের ভিতরে প্রবেশ করতে পারেনি। ভিতরে ব্যবহৃত গ্রানাইট পাথরগুলো আদ্রতা প্রতিরোধী। সেকারণে ফেরাউনদের মমি এখানে সুদীর্ঘকাল অক্ষত থেকেছে।
আধুনিক কালের বিল্ডিংগুলো ইট জোড়া দিতে যে সিমেন্টের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয় তা কয়েকশো বছরের বেশি স্থায়ী হয় যান কিন্তু পিরামিড বাইরের পাথর গুলো জোড়া দিতে এমন বিশেষ ধরণের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়েছে যা পাঁচ হাজার বছর পরেও পাথরগুলোকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।
তবে বর্তমান যুগের আধুনিক যন্ত্র দিয়েও এত সুন্দর আর নিখুঁত ভাবে পাথর কাটা সম্ভব নয়। সময়ের সাথে সাথে তাদের পাথর কাটার প্রযুক্তি যত উন্নতি হয়েছে পিরামিডগুলো তত টেকসই হয়েছে। পিরামিডের ভেতরের পাথরগুলো নিখুঁতভাবে কেটে একটির সাথে আর একটিই এমন ভাবে জোড়া দেয়া হয়েছে যে দুই পাথরের মাঝে এক চুলও ফাঁকা নেই। ফলে হাজার হাজার বছর ধরে বাইরে থেকে কোন পানি বা আদ্রতা পিরামিডের ভিতরে প্রবেশ করতে পারেনি।
ভিতরে ব্যবহৃত গ্রানাইট পাথরগুলো আদ্রতা প্রতিরোধী। সেকারণে ফেরাউনদের মমি এখানে সুদীর্ঘকাল অক্ষত থেকেছে। গবেষকদের ধারণা খুফুর পিরামিড তৈরি করতে এ ধরনের মিশ্রণের দরকার হয়েছে প্রায় 5 লক্ষ টন। পিরামিডের আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এগুলো নক্ষত্রপুঞ্জের সাথে নির্ভুল সামঞ্জস্য রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। পিরামিড নিয়ে বহু গবেষণা করেও আজও এর অনেক রহস্য উম্মোচন করা হয়নি।
দ্বাদশ শতাব্দীতে সুলতান সালাউদ্দিন এর পুত্র সুলতান আল আজিজ ওসমান পিরামিড ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল। দ্যা গ্রেট পিরামিড এর পাশে থাকা সবচেয়ে ছোট পিরামিড দিয়ে তিনি তার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেন। কিন্তু বহু অর্থ খরচ করে এবং দীর্ঘ ৮ মাস কঠোর পরিশ্রম করেও সুলতানের কর্মীরা পিরামিডের খুব বেশি ক্ষতি করতে পারে নাই। এর পর বাধ্য হয়েই সেই উচ্ছেদ অভিযানে ইস্তফা দেয়া হয়।
মিসর ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে যেসব পিরামিড তৈরী করা হয়েছে তার মধ্যে মেক্সিকোর পিরামিড সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই পিরামিডের নাম এল কাস্তিলো। মায়া সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ শহর চিচেন ইৎজায় এই পিরামিডের অবস্থান।
মিশরের সবচেয়ে বড় পিরামিডের নাম কি?
মিশরের সবচেয়ে বড় পিরামিডের নাম খুফুর পিরামিড। এটি দ্যা গ্রেট পিরামিড অফ গিজা নামেও পরিচিত। দ্বিতীয় বৃহৎ পিরামিড হলো খাফ্রের পিরামিড। এটি রাজা খুফুর ছেলে খাফ্রের সমাধি এবং সবচেয়ে পিরামিড হল মেনকাও এর পিরামিড। এটি রাজা খুফুর নাতির সমাধি। ৪৭০০ বছর আগে দ্যা গ্রেট পিরামিড নির্মিত হয়েছিল। সব চেয়ে বড় এই পিরামিড এর আয়তন ৬ টি ফুটবল মাঠের সমান এবং উচ্চতায় ৪২ তোলা বিল্ডিং এর সমান উঁচু।
১৮৮৯ সালে আইফেল টাওয়ার নির্মাণের আগ পর্যন্ত প্রায় 5000 বছর ধরে এই পিরামিডই ছিল মানুষের তৈরি সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা। খুফুর পিরামিড তৈরি করতে প্রায় ২৩ লক্ষ পাথরের ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে। এই ব্লকগুলো প্রায় ৫০০ মাইল দূর থেকে নির্মাণ স্থলে নিয়ে আসা হয়েছে। আড়াই থেকে 50 টন ওজনের প্রায় 23 লক্ষ ব্লক তারা মরুভূমির ভেতর দিয়ে কিভাবে বহন করে নিয়ে এসেছে তা সত্যিই এক বিস্ময়।
পিরামিডের ভিতরে কি আছে?
পিরামিডগুলো বাইরে থেকে দেখতে নিরেট মনে হলেও ভিতরে ঠিক তেমন নয়। পিরামিডের ভিতরে বহু সরু পথ ও গোপণ কুঠুরি বা চেম্বার রয়েছে। খুফুর পিরামিড এর ভিতরে ৩ টি চেম্বার রয়েছে। চেম্বারগুলো হল দ্যা গ্রেট গ্যালারি, রানীর চেম্বার ও রাজার চেম্বার। ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থের নিরেট পাথর কেটে চেম্বার গুলোর প্রবেশপথ নির্মাণ করা হয়েছে। সাধারনত পিরামিড এর কেন্দ্রীয় চেম্বারে ফারাওদের মৃতদেহ রাখা হয়। এই চেম্বারে পৌঁছাতে দেড়শো ফুট সিঁড়ি পার হয়ে যেতে হয়। এ ছাড়া খুফুর পিরামিড এ বেশ কিছু গোপন পথ ও সুড়ঙ্গ রয়েছে যার রহস্য এখনো অজানা।