আমাজন জঙ্গলের ইতিহাস – রেইন ফরেস্ট আমাজন নিয়ে যত অজানা তথ্য!

আমাজন জঙ্গল

অ্যামাজন রেইন ফরেস্ট বা  আমাজন জঙ্গল শুধু পৃথিবীর বৃহত্তম বনাঞ্চলই না, জীব বৈচিত্রের ঘনত্বের বিচারেও  শীর্ষস্থানের অধিকারী। অর্থাৎ এই বনে  প্রতি বর্গমিটারে যে  সংখ্যক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে তা আর কোথাও  চোখে পড়বে না। তবে  বাণিজ্যিক কারণে নিয়মিত এই বনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা উজাড়  করা হচ্ছে। যার পরিণতিতে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষনের  ক্ষমতাও পৃথিবীর ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বিষয়টা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মত অবস্থা তৈরি করেছে। 

সুপ্রিয় পাঠক,
Random Speech এর আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জানাবো পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম আমাজন বন সম্পর্কে ………

আমাজন জঙ্গলের ইতিহাস

বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী বিশ্বের বৃহত্তম এই  জঙ্গল টির সৃষ্টি হয়েছিল আনুমানিক সাড়ে 5 কোটি বছর আগে। এর আগেই ভূপৃষ্ঠের টেকটোনিক প্লেটগুলোর চলনের  ফলে আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা এই  দুটো ভূখণ্ডের  মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।  দুই মহাদেশের  মধ্যবর্তী আটলান্টিক মহাসাগরের আয়তনও একই সাথে  বৃদ্ধি পায়। একই  সময় পৃথিবীর ক্রান্তীয় এলাকার তাপমাত্রা এবং সেখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও  বেড়ে যায়। যার ফলে আমাজন নদীর অববাহিকায় বিশাল এই  বনাঞ্চলটির  সৃষ্টি হয়। সূচনা থেকে পূর্ণাঙ্গ জঙ্গলে পরিণত হতে আমাজনের সময় লেগেছিল প্রায় দুই কোটি বৎসর। অবশ্য  বাণিজ্যিক কারণে বনাঞ্চল ধ্বংসের শুরুর আগে দক্ষিণ আমেরিকার পুরো  পূর্ব উপকূল জুড়ে এই  জঙ্গলের বিস্তৃতি ছিল। 

আনুষ্ঠানিক হিসেবে আমাজন জঙ্গলের বর্তমান আয়তন প্রায় 55 লাখ বর্গ কিলোমিটার বা 21 লাখ বর্গ মাইল। অর্থাৎ আয়তনে এই জঙ্গলটি  প্রায় চল্লিশটি বাংলাদেশের সমান। আমাজন জঙ্গলটি যদি  কোন একক রাষ্ট্র হতো তবে আয়তনে এটি বিশ্বের নবম  বৃহত্তম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন করত। আগে যেমনটা জানানো হয়েছে আমাজন বিশ্বের বৃহত্তম জঙ্গল। আরও নিখুঁত  করে বললে অ্যামাজন জঙ্গল বিশ্বের বৃহত্তম ট্রপিকাল রেইনফরেস্ট বা ক্রান্তীয় বর্ষাপ্রবণ বনাঞ্চল। 

See also  Threads That Last: The Science Behind Stitching Strength in Footwear

আমাজন জঙ্গল কোন দেশে অবস্থিত?

সাধারণত  আমাজন জঙ্গলের কথা শুনলেই মানুষের কল্পনায় ব্রাজিল দেশের নাম ভেসে আসে। কিন্তু আমাজন নদীর অববাহিকা জুড়ে বিস্তৃত আমাজন জঙ্গলের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মূলত  নয়টি দেশের হাতে রয়েছে। যদিও শতকরা প্রায় 60 ভাগ বনাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী ব্রাজিলের সীমানাতেই জঙ্গলটির বেশিরভাগ এলাকা বিদ্যমান। 

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রান্তীয় জঙ্গলের বুক চিরে বয়ে চলেছে বিশ্বের বৃহত্তম নদী গুলোর একটি। প্রায় 7 হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট আমাজন বিশ্বের দীর্ঘতম নদীর তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। মিশরে অবস্থিত নীলনদের দৈর্ঘ্য আমাজনের চেয়ে বেশি। কিন্তু পানি প্রবাহের হিসেবে আমাজনের ধারেকাছেও কোন নদ-নদী নেই।

এই নদীর মোহনা দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় 21 কোটি লিটার পানি আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে পড়ে। পৃথিবীর সবগুলো নদীর মোহনায় যে পরিমাণ পানি প্রতিদিন সাগর বা মহাসাগরে মেশে  তার পাঁচ ভাগের এক ভাগই এই  আমাজন নদীর মোহনা দিয়ে প্রবাহিত হয়। শুধু তাই না, এই আমাজন নদীর অববাহিকা আয়তন হিসেবে বৃহত্তম। এর আয়তন 70 লাখ বর্গ কিলোমিটারের বেশি। 

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো এ নদীর উৎপত্তি প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকশ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত আন্দিজ পর্বতমালায় হয়েছে। অথচ এটি  প্রশান্ত মহাসাগরে মিলিত হবার বদলে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার ঘুরে  আটলান্টিক মহাসাগরে মিশেছে। 

দীর্ঘ এবং খরস্রোতা আমাজন নদীর পুরোটা সাঁতরে এক অনন্য রেকর্ড করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক মার্টিন স্ট্রেইল। 2007 সালে তিনি আমাজন নদীর উৎপত্তিস্থল থেকে শুরু করে মোহনা পর্যন্ত সাঁতরে অতিক্রম  করেন। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য স্ট্রেইলকে টানা ৬৬ দিন প্রতিদিন 10 ঘণ্টা করে আমাজন নদীতে সাঁতার কাটতে হয়েছিল। 

আমাজনের আরেকটি বিস্ময়কর বিষয় হলো এর মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া এক ফুটন্ত নদী। আক্ষরিক অর্থেই এ নদীর পানি অত্যন্ত উষ্ণ। এ নদীর পানির সর্বোচ্চ  তাপমাত্রা ৯৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে।

See also  স্বল্পমেয়াদী অর্থায়ন এবং মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন কাকে বলে ও কি বোঝায়?

আমাজন কে পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয় কেন?

বিশ্বের বৃহত্তম জঙ্গলে বসবাসকারী বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীর প্রজাতি সংখ্যাও আঁতকে ওঠার মতো। আগেই  জানিয়েছি  আমাজন জঙ্গল জীব বৈচিত্রের ঘনত্বের বিচারে বিশ্বে শীর্ষস্থানের  অধিকারী। এখন পর্যন্ত এই জঙ্গলের পুরোটা ঘুরে দেখা সম্ভব হয়নি জীববিজ্ঞানীদের পক্ষে। জঙ্গলের যতটুকু আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে অন্তত 40 হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ এর সন্ধান পেয়েছেন তারা। পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের 20% উৎপাদিত হয় এই আমাজন জঙ্গলে। তাই একে পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয়। 

জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ আমাজন বনে এছাড়াও রয়েছে ১৩০০ জাতের পাখি, ২২০০ জাতের মাছ, ৪২৭ জাতের স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৭৮ জাতের সরীসৃপ, ৪২৮ জাতের উভচর প্রাণী এবং ২৫ লক্ষ জাতের পোকামাকড়। 

এখানকার পাখির মধ্যে স্কারলেট ম্যাকাও পাখিটিকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম সুন্দর পাখি গুলোর একটি।  আকাশে নীল লাল আর  হলুদ রঙের পাখির ঝাঁক উড়ে  যেতে দেখলে মনে হবে আপনি যেন একটা উড়ন্ত রংধনু দেখছেন। এছাড়াও আছে হারপি ঈগল  যারা সুযোগ পেলেই মানুষের বাচ্চা স্বীকার করতে সক্ষম।  

জঙ্গলের  মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা আমাজন নদীর বিপুল মৎস্য প্রজাতির মধ্যে মাংসাশী পিরানহা মাছ তো হলিউডের মুভির  কল্যানে বিভীষিকা সৃষ্টিকারী হিসেবে কিংবদন্তির  মর্যাদা পেয়েছে। পিরানহার  মতো এতটা কুখ্যাত না হলেও পিরারুকু মাছও  বিভীষিকা সৃষ্টিতে কম যায়না। মাংসাশী মাছগুলো সর্বোচ্চ 3 মিটার বা ১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। এদের চোয়ালের পাশাপাশী  জিভ আর কপালেও ভয়ানক দাঁত থাকে।  

আমাজন জঙ্গলে বসবাসকারী উভচর  প্রাণীদের মধ্যে পয়জন ডার্ট ফ্রগ উল্লেখযোগ্য। সোনালী, সবুজ, নীল বা টকটকে লাল রঙের এই ব্যাঙের ত্বক থেকে প্রচণ্ড বিষাক্ত  একটি পদার্থ নিঃসৃত হয়। প্রাকৃতিক সেই বিষ সংগ্রহ করে শিকারে  ব্যবহার করেন আমাজনের বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর সদস্যরা।  

তবে দুঃখের বিষয় হলো গোটা বিশ্বের মতো আমাজনেও চলছে অবাধে বৃক্ষনিধন। অপরিকল্পিত বননিধনের কারণে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন আগামী ৫০ বছরের মধ্যে আমাজনের বনাঞ্চল বিলীন হয়ে যেতে পারে