মেথির উপকারিতা | মেয়েদের জন্য মেথির উপকারিতা

মেথির ইতিহাস এবং উৎস

ভেষজ গুণ সম্পন্ন গাছগুলোর মধ্যে মেথির ব্যবহার অনন্য পর্যায়ে,মেথি দক্ষিণ ইউরোপ এবং এশিয়াতে দেখা যায় ।এটি দেখতে হলুদাভ খয়েরি রঙের হয় । ভিটামিন সমৃদ্ধ এই মেথিতে রয়েছে ফলিক এসিড,নিয়াসিন,বি৬ এবং ভিটামিন সি তে পরিপূর্ণ।রয়েছে প্রয়োজনীয় মিনারেল কপার,পটাসিয়াম,ক্যালসিয়াম,আয়রন,সেলেনিয়াম,ম্যাঙ্গানিজ,

জিঙ্ক এবং ম্যাগনেসিয়াম ।পাতায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘কে’ যা রক্তা পড়া বন্ধ করতে সহায়তা করে ।

মেথির ব্যবহার

লোভনীয় খাবারে পাঁচফোড়ন যেন স্বাদের বাহার ধরে রাখে,পাঁচফোড়ন মানে মেথির ব্যবহার থাকবেই ।মেথি যেন রান্নায় স্বাদবর্ধকের কাজ করে ।মেথির পাতা শাক হিসেবে অনেকেই রান্না করে খান ।তিতা স্বাদযুক্ত হওয়ায় কৃ্মিনাশক হিসেবে ব্যবহার করা যায় ।

চুলের যত্নে মেথি

চুল ঘন ও কালো রাখতে মেথির ব্যবহার হচ্ছে,মেথিতে রয়েছে প্রোটিন ও নিকোটিনিক এসিড যা চুলের ভেতর থেকে পুষ্টি যোগায়,পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়া সহ সামান্য স্প্রে করলে মাথার ত্বক ভাল থাকে ,নতুন চুল গজায়,যা চুল পড়া ব্যক্তির জন্য খুশির কারন ।

দৈনিক আমাদের গড়ে ৫০ থেকে ১০০ টি চুল পড়ে যা স্বাভাবিক কিন্ত এর বেশি পড়লে চিন্তায় কপালে ভাজ পড়বে,এর জন্য রয়েছে মেথি ,যা টনিকের মত কাজ করে ।

নারকেল তেলের সাথে মেথি দানা মিশিয়ে চুলে ব্যবহার করলে নতুন চুল গজায় ও চুলের গোড়া মজবুত হয়,আগের দিনে মানুষ আজকের দিনের মত আধুনিক প্রসাধনী ব্যবহার করতে পারতোনা, কারন তখন এতসব কিছু ছিলনা ।মানুষ প্রকৃ্তির উপর নির্ভর করতো।

গ্রামের চাচীরা,খালারা কিন্ত ওইসব প্রাচীন পদ্ধতি অবলম্বন করেই চুলের সৌন্দর্য  ধরে রাখতো ।আজকের দিনেও আমরা সেইসব পদ্ধতি মেনে চলছি ,আমাদের মূল্যবান চুলকে ধরে রাখার জন্য ।

কন্ডিশনার ও ময়েশ্চারাইজার হিসেবে মেথি

মাত্র এক কাপ পানিতে তিন টেবিল চামচ মেথি ছয় থেকে সাত ঘন্টা ভিজিয়ে ছেঁকে নিয়ে রাখার পর শ্যাম্পু করে ওই পানিটুকু দিয়ে চুল ধুয়ে নিলে কন্ডিশনারের কাজ করবে চুল থাকবে ময়শ্চারাইজ আর চকচকে সুন্দর নমনীয় ,মসৃণ ।

See also  Threads That Last: The Science Behind Stitching Strength in Footwear

চুল পাঁকা কমাতে মেথি

আজকাল চুল পাঁকতে বয়স লাগেনা,অনেকের এম্নিতেই চুল পেঁকে যায় ,পড়ে যায়,যা হতাশার কারণ ।মেথি নারকেল তেলে দীর্ঘক্ষণ ডুবিয়ে রেখে তেল হাল্কা গরম করে মাথায় ম্যাসেজ করলে উপকার পাওয়া যায় । ফলিকলের যেকোন সমস্যায় এই তেল ম্যাজিকের মত কাজ করে ।

রোগ নিরাময়ে মেথি

ঘরোয়া বা গাছড়া ওষুধ কিংবা কবিরাজিতে মেথির জুড়ি নেই ।বিভিন্ন ধরনের রোগ নিরাময় বা শারীরিক সমস্যায় মেথির ব্যবহার বহুল প্রচলিত ।জ্বর বা শর্দি-কাশির  মত সিজনাল রোগে মেথি চমৎকার কাজে দেয় ।

রূপচর্চায় মেথি

রুপচর্চায় মেথি বহুল ব্যবহৃত ,বয়স ধরে রাখে এই মেথি,বয়সের ছাপ দূর করা সহ ত্বকের কালো দাগ ,ত্বকের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা নিরাময় করে । চোখের নিচের কালো দাগ ত্বকের পোড়া ভাব দূর করে দেয় মেথি ।বিষাক্ত উপাদান শরীর হইতে নিষ্কাশন করে ত্বকের উজ্জ্বল ভাব আনে ।চেহারা হয় দীপ্তিময় উজ্জ্বল ও ফর্সা ।

ব্রণের বিস্তার রোধে মেথি

মেথি ত্বকের বিষাক্ত পদার্থকে বের করে দেয় ,ফলে ব্রণের বিস্তার কমে যায়,মেথি মধুর সাথে মিশিয়ে পেস্ট করে ত্বকে লাগিয়ে পরে ধুয়ে ফেললে ভালো ফলাফল আসে ।

বাতব্যথা নিরাময়ে মেথি

বাতের ব্যথা খুব অসহ্য ব্যথা এ থেকে পরিত্রাণ পেতে অনেকে হাজার হাজার টাকা খরচ করে ফেলে,বাতরোগে ব্যবহৃত মেথি প্রাচীন পদ্ধতি হলেও বেশ উপশম হয় ব্যবহারে। আদা চূর্ণের সাথে সমপরিমাণ মেথি গুড়ের সাথে মিশিয়ে খেলে অল্প দিনের মধ্যেই গেঁটে বাত পালাবে ।

পেটের অসুখে মেথি

মেথিগুঁড়ো ঘোল বা দইয়ের সাথে খেলে আমাশয় হইতে আরোগ্য লাভ হয় ।মেথি উদরশূল,পেটে জমে থাকা বায়ুর অস্বস্তিকর অবস্থা হতে দেয় পরিপূর্ণ স্বস্তি।মেথি লিভার ভালো রেখে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ।

গর্ভবতী মায়েদের উপকারে মেথি

গর্ভবতী মায়েদের বুকের দুধ বৃদ্ধিতে মেথি বীজ চমৎকার কাজে দেয়,সন্তানের ওজন ও সঠিক থাকে ।মেথি বীজে থাকে ফাইটোস্ট্রোজেন যা বুকের দুধ বৃ্দ্ধিতে সহায়তা করার পাশাপাশি মায়ের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমায় ।

রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে মেথি

মেথি বীজ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সম্পূর্ন প্রাকৃ্তিক ঔষধ ,টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মেথি ম্যাজিকের মত কাজ করে ।মেথিতে রয়েছে সলিউবল ফাইবার যা,সুগার শোষণ করে সুগারের মাত্রা বজায় রাখে ।

See also  স্বল্পমেয়াদী অর্থায়ন এবং মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন কাকে বলে ও কি বোঝায়?

ক্যান্সার প্রতিরোধে মেথি

স্তন ও কোলন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে মেথি কার্যকরি ভূমিকা রাখে,শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিয়ে ক্যান্সার কোষ জন্ম নেয়ার ঝুঁকি কমিয়ে দেয় ।মেথি বীজে থাকা নানানরকম মিনারেল উপাদান শরীরের ক্ষয় রোধ করে । 

চর্মরোগে মেথির উপকারিতা

মেথিগুঁড়ো পোড়া,ফোঁড়া বা ক্ষত স্থানে লাগালে বেশ উপকার পাওয়া যায়,যারা এলার্জি সমস্যায় ভোগেন তারা সকালে খালি পেটে মেথিরগুঁড়া মেশানো পানি পান করলে ইনশা আল্লাহ্‌ এলার্জি সমস্যা অনেকাংশে দূরীভূত হয়ে যাবে ।

ওজন কমাতে মেথি

অতিরিক্ত ওজন কখনোই ভালো নয়,যাদের ওজন বেশি তারা প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখীন হন । স্বাস্থ্য মানেই সুস্থ্য এ কথা একেবারেই ভুল ।আমরা সকলেই জানি,”সু-স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল।” অতিরিক্ত ওজনের জন্য অনেক সময় কটু কথা শুনতে হয় যা কখনোই কাম্য নয় ।মেথি শরীরের ক্ষতিকারক প্রোটিন সমূহ ঝরিয়ে শরীরকে করে সুন্দর ও ফিট ।

যাদের বয়স পঞ্চাশোর্ধ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি নিয়ে দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাদের জন্য মেথি খুব ভালো কাজে দেয় ।

ক্ষুদা নিয়ন্ত্রণে মেথি

এক গবেষণায় দেখা গেছে,নিয়মিত যারা মেথি খান তাদের মধ্যে ফাস্ট ফুড,চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণের হার কমে গেছে,এমনকি তারা শারীরিকভাবে থাকছেন আগের চেয়ে অনেক সুস্থ,অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের মাত্রা হ্রাস পেয়ে থাকছেন স্লিম আর সুন্দর ।

হজমশক্তি বৃ্দ্ধিতে মেথি

অনেকের হজমে ব্যপক গণ্ডগোল থাকে,খাবার ঠিকমত হজম হয়না ফলে পেটের অসুখ সহ নানান পীড়ায় জর্জরিত হয় ।মেথিতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার আর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট  যা হজমে সহায়তা করে শরীরকে করে প্রফুল্ল ।তাই হজম সমস্যা নিরসনে সকালে মেথিরগুঁড়া মিশ্রিত পানি খেলে সমস্যা দূর হয়ে যাবে ।

স্বাস্থ্যরক্ষায় মেথির চা

শুনে আশ্চর্য হলেও বাস্তব হচ্ছে মেথির চা অনেক উপকারী ।সাধারনভাবে যেভাবে আমরা চা প্রস্তুত করি,মেথির চা ও এভাবেই প্রস্তুত করা যায় ।মেথির চা খেলে যে উপকার পাওয়া যায় তা হলোঃ

  • প্রসাব ক্লিয়ার হয়
  • কিডনি ভাল থাকে
  • কিডনিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে যায়
  • ধমনী ও শিরার চর্বি জমাট বাধেনা
  • হার্ট ভালো থাকে
  • মেদ কমে শরীর ফিট হয় 
  • অতিরিক্ত চাপ কমে তাজা অনুভূত হয়

গল্প বা কাজের ফাকে চায়ের আড্ডা জমে ওঠে,বাঙালি  চা ছাড়া মনে হয় কথা বলতে জানেনা,আর যদি তাতে আনা যায় ভিন্ন স্বাদ তাহলে আপনি নিজের উপকার করছেন ভেবে নিন; কারন মেথি চায়ের উপকারিতা ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি ।

See also  Nancy Harmon Gospel Singer Biography, Age, Net Worth

পুরুষের জন্য মেথি

মেথি সব বয়সের নারী-পুরুষের জন্য উপাদেয় পথ্য,তবে বিবাহিত পুরুষ যারা দীর্ঘদিন যৌন সমস্যায় ভুগছেন বা যৌন দূর্বলতা আছে তাদের জন্য মেথি উপকারি ওষুধ ।পুরুষের সেক্স হরমোন উৎপাদনকারী  টেস্টোস্টেরন এর মাত্রা বাড়িয়ে দেয় মেথি ফলে বিবাহিত জীবনে আসে অনাবিল সুখ-শান্তি ।হারানো পৌরষত্ব ফিরে পেতে মেথি টনিকের মত কাজ করে ।অনেক ক্যামিকেল বা কৃ্ত্রিম মেডিসিন ব্যবহারে উপকারের চাইতে অপকার বয়ে আনে,তাই মেথির ব্যবহার সেই সকল পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা নেই,মেথি ব্যবহার নিরাপদ ।

মাসিকের ব্যাথায় মেথির উপকারিতা

পিরিয়ডের ব্যাথা মেয়েদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ব্যাপার হলেও অত্যন্ত অসহ্যকর,অনেকে যন্ত্রণা না সইতে পেরে কান্না করে দেন ।এই সমস্যাগুলো এতটাই স্বর্শকাতর যে মেয়েরা কারো সাথে শেয়ার করতে চান না,তাদের কর্মক্ষত্রে এই সমস্যা হতে মুক্তি পেতে মেথির ব্যবহার নজরে আসার মত ,মেথি “চা” অত্যন্ত কার্যকর ব্যথা কমাতে সাহায্য করে ।

রান্না-বান্নায় মেথি

সকাল কিংবা সন্ধ্যা নাস্তা ছাড়া আমাদের চলেনা,প্রত্যহ কাজের ফাঁকে বা ক্লান্তিতে আমরা নাস্তা খেয়ে কিছুটা শক্তি-সঞ্চার করি ।নাস্তা তৈরিতে মেথির ব্যবহার লক্ষণীয় মেথির পরোটা কিংবা সবজি নাস্তা হিসেবে খাওয়া যায় ।এতে আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা যেমন মিটে তেমনি খাদ্যের গুণাগুণ বজায় থাকে ।

জ্বর কমাতে মেথি

সিজনাল সমস্যাতে জ্বর আসতে পারে,তাই বলে হুটহাট এন্টিবায়োটিক খাওয়া যাবেনা,এতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে,সামান্য লেবুর সাথে মেথি মিশিয়ে খেলে জ্বর নেমে যাবে ।

মেথি ব্যবহারে সতর্কতা

মেথির উপকারি দিক এত বেশি যে বর্ণনা করে শেষ হবার নয়,আমরা ইতিপূর্বে ব্যবহার ও উপকারিতা জেনেছি,তবে এ কথা মানতে হবে যে,কোন কিছুই অতিরিক্ত ভালো নয়,দীর্ঘদিন মেথি ব্যবহারে ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হতে পারে,তবে ভয়ের কোন কারন নেই ।তেতো স্বাদযুক্ত হওয়াতে অনেকে অপছন্দ করে,মুখে নিতে বমি ভাব চলে আসে ।

এ কথা সত্য যে,খেতে ভাল লাগে না এমন জিনিস বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঔষধি গুণ সমপন্ন হয়ে থাকে ।তবুও অসুখ থেকে রেহাই পেতে খেতে হয় বা কারন বিশেষে ব্যবহার করতে হয় ।

একগ্লাস পানিতে মেথি

সকালে এক গ্লাস পানির সাথে মেথি মিশিয়ে খেলে খুব উপকারে দেয়,দিনের শুরুটা ভাল হয়,তবে অতিরিক্ত দানা ব্যবহার করা যাবেনা ,নির্দিষ্ট পরিমাণ বা সামান্য পরিমাণ, পানির সাথে মিশিয়ে খেতে হবে ।পানিতে ভিজিয়ে খেলে আরো ভাল ফল দিবে,তবে ভেজে নিলে গুনাগুণ অর্ধকের বেশি নষ্ট হয়ে যায়,মচমচা খেতে চাইলে সূর্যের তাপে শুকিয়ে নেয়া যেতে পারে এতেও গুনাগুণ অক্ষুন্ন থাকবে ।

শেষ কথা

মেথি আমাদের উপকারি উপাদানগুলোর মধ্যে একটি তা বলার অপেক্ষা রাখেনা,ইতিপূর্বে মেথির ব্যবহার সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারনা পেয়েছি,এটার প্রসারতা আরো বাড়াতে হবে,বৈজ্ঞানিকভাবে আরো পরীক্ষালদ্ধ করতে হবে যাতে উন্নত বিশ্বে এর চাহিদা বাড়ে আর জটিল রোগ নিরাময়ে যুগোপযোগী হয় ।

সমস্যা সমাধানে মেথি যেন চমক,বেশিরভাগ শারীরিক অসুস্থায় মেথি যেন ঘরোয়া টোটকা,তাই পরিমিত পরিমাণ মেথি খাওয়ার অভ্যাস গড়ি সুস্থ থাকি ।